এই মহিলাকে নিয়ে খুব একটা কিছু বলতে শুনি না কাউকে!
অথচ তৃতীয় বিশ্বের এক উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে আজও বছরে প্রায় আধাকোটির উপর শিশু একপ্রকার বিনাচিকিৎসায় মারা যায় সেখানে ওঁর প্রাপ্য ছিল সুপার সেলিব্রিটির সম্মান!
কিন্তু দেশটার নাম ভারত। এখানে ক্রিকেটার, অভিনেতা, রাজনীতিক যতটা সেলিব্রিটি ততটা আর কেউ নয়।
তাই রাস্তাঘাটে এলোপাথাড়ি জিজ্ঞাসা করে দেখুন! পলক মুচ্ছল’কে কেউ চেনেই না প্রায়। দুয়েকজন বলবে, গান-টান গায়।
অথচ মাত্র ৩২ বছর বয়সে পলক যা যা করেছেন তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে!
পলক মুচ্ছল গান করেন। মাত্র চারবছর বয়সে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ কল্যাণজী-আনন্দজী লিটল স্টার গ্রুপের হাত ধরে। মাত্র নয়বছর বয়সে প্রথম অ্যালবাম! চোদ্দবছর বয়সে ছোট্ট শহর ইন্দোর থেকে বলিউডে আগমন। ততদিনে তিনটে অ্যালবাম বেরিয়ে গেছে হইহই করে। বলিউডে পা দিয়েই টি-সিরিজের হাত ধরে চতুর্থ অ্যালবাম। আর ঐ একই বছরে প্রথম প্লেব্যাক বলিউড সিনেমায়!
এরপর “বীর’, ‘এক থা টাইগার’, ‘আশিকি ২’, ‘প্রেম রতন ধন পায়ো’, ‘এম এস ধোনি’সহ একের পর এক সিনেমায় হিট গান। ‘জুম্মে কি রাত’, ‘নাইয়ো লাগদা’ সহ অন্তত একডজন ব্লকবাস্টার গান তাঁর ঝুলিতে!
বাংলা, পাঞ্জাবী, তামিল, গুজরাটি, তেলেগু, কন্নড়, ওড়িয়াসহ ১৭টা ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন ও গাইছেন পলক।
এসব শুনেও কেউ কেউ বলবেন বলিউডে এমন কত আসে আর যায়! উনি স্পেশাল কীসে?
হ্যাঁ, সেই স্পেশালিটির গল্প বলব বলেই তো এত শিবের গীত!
কার্গিল যুদ্ধের সময় মাত্র সাতবছর বয়সে নিজের শহর ইন্দোরে পথে পথে ঘুরে গান গেয়ে ২৫,০০০/- তুলে দিয়েছিলেন আহত সেনাদের চিকিৎসার জন্য!
কে? এক ছাপোষা মধ্যবিত্ত দম্পতির সাতবছর বয়সী মেয়ে পলক!
ঐ একই বছর, ১৯৯৯তে উড়িষ্যা সাইক্লোনে ত্রাণের জন্য ইন্দোরের দোকানে দোকানে ঘুরে গান গেয়ে তুলেছিলেন ৩৮,০০০/-!
পরেরবছর ইন্দোরের এক স্কুলছাত্রের হার্ট অপারেশনের জন্য আটবছরের পলক রাস্তায় শো করে তুলে দিয়েছিলেন ৫১,০০০/-! স্রেফ পলকের ঐ উদ্যোগের কথা শুনে ডঃ দেবী শেঠি সেই ছাত্রের অপারেশন বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নেন।
কেমন রূপকথার মত লাগছে না?
রূপকথা যখন বাস্তব হয় তা বোধহয় অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
সেই ছাত্র, লোকেশের চিকিৎসার হিল্লে হয়ে যাওয়ার আনন্দে তার মা-বাবা স্থানীয় খবরের কাগজে জানালে চোখের নিমেষে উঠে আসে আরও তেত্রিশজন হতভাগ্য শিশুর কথা যারা হার্টের দুরারোগ্য রোগে ভুগছিল!
ঐ ২০০০ সালেই আটবছরের পলক একের পর এক স্টেজশো করে তাদের জন্য তুলে দেন ২,২৫,০০০/- যা দিয়ে পাঁচজন শিশুর সফল হার্ট অপারেশন হয়।
সেই শুরু! ২০০১এ গুজরাত ভূমিকম্পপীড়িতদের জন্য পলক স্টেজ’শো করে তুলে দেন ১০ লক্ষ টাকা।
দুরারোগ্য হার্টের অসুখে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করেন ব্যানার – দিল সে দিল তক!
ঐ বয়সে তাঁর বন্ধুবান্ধব যখন স্কুলের পর পার্কে যাচ্ছে খেলতে, ছুটির দিনের সন্ধ্যায় যাচ্ছে আঁকার বা নাচের স্কুলে, সদ্য দশে পা দেওয়া পলক তখন স্টেজ শো করে চলেছেন সমবয়সী দুঃস্থ শিশুদের একটা সুস্থ জীবন দিতে!
২০০১ থেকে ২০০৬, পাঁচবছরে পলক তাঁর ছোটভাই পলাশকে সঙ্গে নিয়ে হাজারেরও বেশি স্টেজ’শো করে তুলেছিলেন ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা যা দিয়ে বাঁচানো গেছিল ২৩৪ জন শিশুর প্রাণ!
ততদিনে কিশোরী পলক নিজেই তৈরি করে ফেলেছেন ‘পলক মুচ্ছল হার্ট ফাউন্ডেশন’!
আঠারোয় পা দেওয়ার আগেই পলক মুচ্ছল আয় করেছেন মোট পৌনে দু’কোটি টাকা। প্রাণ বাঁচিয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন শিশুর!
আজ বত্রিশে পা দিয়েও পলক মুচ্ছল ঐ এক সাধনায় মেতে আছেন! ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, প্রচারের ঢক্কানিনাদ নেই কোথাও!
ইন্দোর, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর হার্ট স্পেশালিস্টদের হিসেব অনুযায়ী ২০২৪এর শেষ অবধি এযাবৎ ৩,০০০এরও বেশি শিশুর হৃদযন্ত্রের অপারেশন হয়েছে পলক ও পলাশের অর্জিত অর্থে!
৩,০০০এর বেশি শিশু আজ পড়ছে, খেলছে, গাইছে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচছে পলকের হাত ধরে!
তবু পলক মুচ্ছলকে নিয়ে কথা হয় না! এ পোড়া দেশে পলক কোনও সেলিব্রিটি নন!
ওঁর একটা ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি তো এখন একজন প্রতিষ্ঠিত প্লেব্যাক সিঙ্গার! তাও এত কনসার্ট বা স্টেজ শো করেন কেন?’
নির্দ্বিধায় উত্তর দিলেন – ‘আমার কাছে একটা কনসার্ট মানে ১০ – ১২টা বাচ্চার হার্ট অপারেশন। করব না?’
শৈশব থেকে হাজারো অন্ধকার বুকের খাঁচায় নিরলস আলো জ্বালিয়ে যাওয়া পলক মুচ্ছল হয়ত নিজেই চান না অমন প্রচারের আলোয় আসতে! যার ছটায় আড়ম্বর থাকলেও প্রাণ নেই!
Palak Muchhal কে নিয়ে লিখেছেন: